মঙ্গলবার ২৬ জানুয়ারি ২০২১ ১৩ মাঘ ১৪২৭
শিরোনাম: জলবায়ুর ক্ষতি পুষিয়ে নিতে বৈশ্বিক উদ্যোগ গ্রহণে ব্যর্থতার জন্য অর্থ ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবই দায়ী : প্রধানমন্ত্রী       চীন ও ভারতের সৈন্যরা ‘নতুন করে সীমান্ত সংঘর্ষে’ জড়িয়েছে       ক্যারিবীয়দের ‘বাংলাওয়াশ’       সাইবার অপরাধীদের জন্য স্বর্ণখনি হয়ে উঠেছে গুগল ড্রাইভ       আইপিএলে নতুন ভূমিকায় সাঙ্গাকারা       পিকে হালদারের সহযোগী উজ্জ্বল ও রাশেদুল রিমান্ডে       ফখরুল ‘ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত কি-না’ সন্দেহ হাছান মাহমুদের      
করোনায় শিশু-কিশোরদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়ন
মোহাম্মদ সানাউল্লাহ
প্রকাশ: শনিবার, ৯ জানুয়ারি, ২০২১, ৫:২৩ পিএম |

স্কুল, বন্ধু, খেলাধুলা, পার্ক, মাঠ, হোম টিউটর সব হারিয়ে যেন শিশুগুলো ডানাভাঙা পাখি হয়ে যায়। ওদের আকাশ যেন বেদখল হয়ে গেছে। ওদের একমাত্র অবলম্বন হয়ে দাঁড়ায় বাবা, মা আর ডিজিটাল মিডিয়া যেমন মোবাইল, টিভি, ইউটিউব ইত্যাদি। কিন্তু বাবা-মায়েরাই কি খুব স্থির মানসিকতা নিয়ে শান্ত মেজাজে আছেন? কেউ হারিয়েছেন চাকরি, কারো ব্যবসা মন্দা। কেউ কেউ ভুগছেন খাদ্য সমস্যায়। অনেকেই আক্রান্ত হচ্ছেন করোনায়। যত সমস্যাই থাকুক সবকিছুর আগে রক্ষা করতে হবে শিশু-কিশোরদের শারীরিক ও মানসিক অবক্ষয় থেকে। এই সময়ে শিশু-কিশোর, তরুণসহ যে কারো মধ্যে উদ্বিগ্নতা, তীব্র মানসিক চাপ, ঘুমের সমস্যা, বিষণ্নতা বা অবসাদ, পরিবর্তিত পরিস্থিতি মানিয়ে চলার সমস্যা, আতঙ্ক ইত্যাদি মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিতে পারে। আর যেসব শিশু-কিশোর, তরুণ আগে থেকেই কোনো শারীরিক বা মানসিক সমস্যায় ছিল, তাদের লক্ষণগুলো অনেকগুণ বেড়ে যাবে।এই সময়ে শিশু-কিশোর আর তরুণদের মধ্যে যেসব মানসিক লক্ষণ বেশি দেখা দিতে পারে, তা হলো :
ঘুমের রুটিন পরিবর্তন হয়ে যাওয়া : সারা রাত জেগে থাকা আর সারা দিন ঘুমানোর অভ্যাস গড়ে উঠতে পারে। ফলে মস্তিষ্কের বায়োলজিক্যাল ক্লক এলোমেলো হয়ে যায়, যা আবেগ আর আচরণকে পরিবর্তন করে ফেলে।
কোনো কাজে মন বসে না : কোনো কিছুতেই মনোযোগ দিতে পারে না। এমনকি পছন্দের বিষয়টিতেও।
জরুরি বিষয়গুলো ভুলে যাওয়া : সাধারণ বিষয়গুলোও ভুলে যেতে থাকে। দৈনন্দিন বিষয়গুলো মনে রাখতে না পারা।
আবেগজনিত অসুবিধা : আবেগের বহিঃপ্রকাশ খুব বেশি হতে পারে, আবার কারো কারো ভাবাবেগ হ্রাস পেতে পারে। কেউ বেশি বেশি কান্নাকাটি করতে পারে, কেউবা একদম স্তব্ধ হয়ে যেতে পারে, কেউ বিনা কারণে অতি উৎফুল্লও হতে পারে!
আচরণের সমস্যা : হঠাৎ রেগে যাওয়া। আগ্রাসী আচরণ করা। এলোমেলো কথা বলার মতো লক্ষণও থাকতে পারে কারো কারো মধ্যে।
পারিবারিক সম্পর্কের অবনতি : দেখা যায় এ সময় কাছের মানুষের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হচ্ছে এবং সম্পর্কগুলো নষ্ট হচ্ছে।
বিভিন্ন শারীরিক লক্ষণ : বুক ধড়ফড় করা, ফুসফুসের সব ঠিক থাকা সত্ত্বেও নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসার অনুভূতি, ঘাম হওয়া, হাত-পা ঠা-া হয়ে আসা, শরীরে শক্তি না পাওয়া ইত্যাদি সমস্যা দেখা দিতে পারে।
আসক্তি বেড়ে যাওয়া : অধিকাংশ ক্ষেত্রে ইন্টারনেট বা ইলেকট্রনিক গ্যাজেটে আসক্তি বেড়ে যেতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মাদকাসক্তিও দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
চেনা জায়গা বা চেনা মানুষ চিনতে না পারা : অনেক সময় তীব্র মানসিক চাপের কারণে আশপাশের পরিচিত মানুষ, স্থান, সময় ইত্যাদি সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
শিশুদের বিশেষ সমস্যা : একদম যারা ছোট শিশু তারা মা-বাবাকে বেশি করে আঁকড়ে ধরে রাখতে চায়। কেউবা নিজেকে গুটিয়ে রাখে। কেউ বেশি কান্নাকাটি করে, মা-বাবাকে সারাক্ষণ প্রশ্ন করতে থাকে।
শিশুর শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষায় ডাক্তার, মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বেশ কিছু উদ্যোগের কথা বলেছেন। সেগুলো মা-বাবার জন্য বিশেষ উপকার আসবে :
রুটিন : শিশুকে বয়সভেদে একটি কার্যকর প্রত্যহিক রুটিন করে দেয়া। ঘুম থেকে ওঠা, খাওয়া, পড়াশোনা, টিভি দেখা, বাসা বাড়ির কাজে অভিভাবককে সাহায্য করা। ঘুমের কমপক্ষে দুই ঘণ্টা আগেই মুঠোফোন, ল্যাপটপ বা টিভি দেখা বন্ধ করতে হবে।
পাল্টাতে হবে দৃষ্টিভঙ্গি : ঘরে থাকাকে বন্দিত্ব মনে করা যাবে না। কেউ ঘরবন্দি নয়। বাইরের পৃথিবীটাই বন্দি। ঘরে সবাই মুক্ত। ভাইরাস থেকে মুক্ত। সংক্রমণ থেকে মুক্ত। এই কথাগুলো ছেলেমেয়েদের বুঝাতে হবে।
গুজবে কান দেয়া যাবে না : সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা সবকিছু বিশ্বাস করা যাবে না। কেবল নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য গ্রহণ করা সমীচীন।
প্রযুক্তিতে আসক্তি নয় : সামাজিকভাবে সংযুক্ত থাকতে হবে, কিন্তু তাই বলে ইন্টারনেটে আসক্ত হওয়া চলবে না। ইন্টারনেটের যৌক্তিক ব্যবহার করতে হবে।
খাদ্যাভ্যাস : শিশুর খাদ্যে শাক, সবজি, ফলমূল, ডিম, দুধ প্রাধান্য দেয়া। ফাস্টফুড, গুরুপাক খাবার যথাসম্ভব এড়িয়ে চলা। সপ্তাহে একদিন শিশু-কিশোরদের পছন্দসই খাবার দেয়া যেতে পারে।
পাঠাভ্যাস : একটা নির্দিষ্ট সময় পাঠ্যপুস্তক পড়ানো। অন্যান্য ভালো বই যেমনÑ মনীষীদের জীবনী, নবী রাসুলদের জীবনী, শিশুতোষ গল্প-কবিতা ইত্যাদি পড়ার জন্য কিছুটা সময় অতিবাহিত করা।
বিনোদন : বাচ্চাদের উপযোগী অনুষ্ঠান দেখা। সিসিমপুর, মীনা কার্টুন, জঙ্গল বুক ইত্যাদি কার্টুন দেখা যেতে পারে। ক্যারাম, দাবা, লুডু খেলা। ড্রয়িং এবং অন্যান্য সৃষ্টিশীল কাজে সময় কাটানো। শিশু-কিশোরদের উপযোগী মুভি যেমনÑ ‘বেবিস ডে আউট’, ‘পেডিংটন’ এ রকম মুভিগুলো একসঙ্গে দেখা। একসঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করা।
পরিবারের সঙ্গে সম্পৃক্ততা : পরিবারের কাজে শিশুকে সম্পৃক্ত করা। কাপড় পরিষ্কার করা, ঘর পরিষ্কার রাখা, বাথরুম নিয়মিত পরিষ্কার করা, ফার্নিচার মোছা ইত্যাদি কাজে শিশু-কিশোরদের সম্পৃক্ত করলে তাদের সময় ভালো কাটবে এবং শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হবে। তাকে বোঝানো দরকার যে, সেও পরিবারের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য।
মানসিক উৎকণ্ঠা ও দুশ্চিন্তা দূরীকরণ : শিশুরও বড়দের মতোই মহামারি নিয়ে দুশ্চিন্তা এবং উৎকণ্ঠা কাজ করে। শিশুদের উপযোগী তথ্য তাকে জানিয়ে তাকে আশ্বস্ত করা যে, এই দুঃসময় থাকবে না। সাবধানে থেকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললে আমরা নিরাপদে থাকতে পারব।
ব্যায়াম : প্রতিদিন নিয়মমাফিক কিছু ব্যায়াম করানো খুব প্রয়োজন। ওঠাবসা করা, ঘরে বসেই হালকা জগিং করা। ঘরের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কাজে সহযোগিতা করা।
সামাজিক যোগাযোগ অব্যাহত রাখা : শিশু-কিশোরদের বন্ধু, শিক্ষক ও সমবয়সিদের সঙ্গে যোগাযোগ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এ পরিস্থিতিতে সামাজিক যোগাযোগ ও মানসিক ভাব বিনিময়ের জন্য শিশুদের বন্ধুদের সঙ্গে, শিক্ষকের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করিয়ে শিশুর সামাজিক যোগাযোগ অনেকটুকু ঠিক রাখার চেষ্টা করতে হবে।
শিশুবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা : বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থা শিশুর জন্য ভয়, ভীতিহীন নির্মল পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। শিশু-কিশোরদের বোঝানো যে, এটা একটা সাময়িক বৈশ্বিক সমস্যা। এটা একসময় ঠিক হয়ে যাবে। মানুষ আবারো দুর্যোগের বিরুদ্ধে জিতবে।
সর্বোপরি বাবা, মা এবং পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠদের সময় দিয়ে বন্ধুবৎসল আচরণই শিশুদের এই দুঃসময় পাড়ি দিতে সাহায্য করবে। আজকের চারা গাছটি একদিন মহিরুহ হয়ে ফুল, ফল আর ছায়া দেবে। লেনিন, বঙ্গবন্ধু, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল সবাই একদিন ছোট্ট শিশুটি ছিলেন। আপনার শিশুটিই ভবিষ্যতের বড় আমলা, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, সেনা কর্মকর্তা হবে। প্রয়োজন যতœ আর সচেতনতা।
গ্রহণকাল কেটে যাবে, আবারো বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ মুখরিত হয়ে উঠবে শিশু-কিশোরদের পদচারণায়। করোনা ভাইরাস পুরো বিলীন হোক আর না-ই হোক, এই মহামারিকাল কিন্তু একসময় থাকবে না। ধাপে ধাপে নতুন জীবনধারার সঙ্গে সবাইকে মানিয়ে নিতেই হবে। সেই অনাগত পৃথিবীতে হয়তোবা মোটেই করোনা ভাইরাসের অস্তিত্ব থাকবে না অথবা এই ভাইরাসের সঙ্গেই আমাদের বসবাস করতে হবে। সেই নতুন পৃথিবীতে শিশু-কিশোর-তরুণরাই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনায় প্রবীণদের কার্যক্রম খানিকটা শ্লথ হয়ে আসবেই। করোনা ভাইরাস থাকুক আর না-ই থাকুক, আমাদের সামাজিক আচরণ, জগৎ সম্পর্কে ধারণা (কগনিশন), আমাদের নীতিনৈতিকতা আর আবেগ অনেকাংশেই পরিবর্তিত হয়ে যাবে। প্রযুক্তিনির্ভর কর্মপরিবেশ তৈরি হবে। আমূল বদলে যাবে স্বাস্থ্যব্যবস্থা। শিক্ষাব্যবস্থাও সাজবে নতুন রূপে। করোনা মহামারির দ্বিতীয় ঢেউ সামাল দিয়ে আমাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতে হবে। প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের শিশু-কিশোরদের জন্য চালু হয়েছে টিভিতে শিক্ষা কার্যক্রম। সরকার সর্বান্তকরণে চেষ্টা করছে প্রজন্মকে এই মহামারির ক্ষতির হাত থেকে বাঁচাতে। সবাইকে শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। প্রয়োজন অভিভাবকদের অনেক বেশি সচেতন আর যতœবান হওয়া।

লে. কর্নেল মোহাম্মদ সানাউল্লাহ : কলাম লেখক; জিএসও-১, রিসার্চ এমআইএসটি, মিরপুর সেনানিবাস।

এনএনবি নিউজ /ডিকে








সর্বশেষ সংবাদ
ইউল্যাবের শিক্ষার্থী ধর্ষণ মামলায় সাউথ ইস্টের সাদমান রিমান্ডে
জলবায়ুর ক্ষতি পুষিয়ে নিতে বৈশ্বিক উদ্যোগ গ্রহণে ব্যর্থতার জন্য অর্থ ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবই দায়ী : প্রধানমন্ত্রী
চীন ও ভারতের সৈন্যরা ‘নতুন করে সীমান্ত সংঘর্ষে’ জড়িয়েছে
ক্যারিবীয়দের ‘বাংলাওয়াশ’
এবার রাজনীতিতে অভিষেক অভিনেত্রী কৌশানীর
সাইবার অপরাধীদের জন্য স্বর্ণখনি হয়ে উঠেছে গুগল ড্রাইভ
আইপিএলে নতুন ভূমিকায় সাঙ্গাকারা
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে নৌকায় ভোট চাইলেন মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরা
চসিক নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী সালাউদ্দিনে বাসায় গুলি
চসিক নির্বাচন অত্যন্ত সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা হবে : সিইসি
কোভিড-১৯ টিকা : ব্রিটিশ চিকিৎসকদের সতর্কতা
ব্রিটিশ বাংলাদেশী চিকিৎসকদের নেতৃত্বে ব্রিটিশ হেলথ এলায়েন্স
তিন দফা দাবিতে ইবি ছাত্র ইউনিয়নের গণস্বাক্ষর
নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর আত্মত্যাগ : ’৭১-এ বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করেছে
সম্পাদক : মোল্লা জালাল | প্রধান সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ৪২/১-ক সেগুনবাগিচা, ঢাকা-১০০০, বাংলাদেশ।  ফোন +৮৮ ০১৮১৯ ২৯৪৩২৩
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত এনএনবি.কম.বিডি
ই মেইল: [email protected], [email protected]