বৃহস্পতিবার ২১ অক্টোবর ২০২১ ৫ কার্তিক ১৪২৮
শিরোনাম: কুমিল্লা হবে ‘মেঘনা’, ফরিদপুর ‘পদ্মা’ বিভাগ : প্রধানমন্ত্রী       পাপুয়া নিউগিনিকে হারিয়ে বিশ্বকাপের মূল পর্বে টাইগাররা       মানুষের পাশে অতন্দ্র প্রহরীর মতো রয়েছে সরকার ​: তথ্যমন্ত্রী       একটি শক্তিশালী বিরোধী দল সরকারও চায় : কাদের       কুমিল্লার কাজটি সে তো প্ল্যান মাফিক করেছে : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী       পূর্বাচলে প্রদর্শনী কেন্দ্রের উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী       এস কে সিনহার বিরুদ্ধে মামলার রায় ফের পেছাল      
সাংবাদিকতা পেশার ভবিষ্যৎ
মোল্লা জালাল
প্রকাশ: রোববার, ২১ মার্চ, ২০২১, ১১:৫৮ এএম |

বলাই হয়, সাংবাদিকতা ঝুঁকিপূর্ণ পেশা। কেন ঝুঁকিপূর্ণ? এ প্রশ্নের সহজ উত্তর হচ্ছে, এখানে জীবন-জীবিকার কোনো নিশ্চয়তা নেই। ঝড়, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, মহামরি যা-ই হোক একজন সরকারি কর্মচারী মাস শেষে নির্দিষ্ট পরিমাণের অর্থ পান। চাকরি শেষে অবসরকালেও তারা পেনশন পান। ফলে কর্মক্ষম থাকার সময় থেকে শুরু করে কর্মহীন অবস্থায়ও সরকারি কর্মচারীদের জীবন-জীবিকার নিশ্চয়তা রয়েছে, কিন্তু সাংবাদিকদের নেই। যে যত বড় প্রতিষ্ঠানেই কাজ করুন, যত মেধাবিই হোন না কেন, কখন কী কারণে চাকরি যাবে তার কোন ঠিক-ঠিকানা নেই। আবার চাকরি করলেও কবে কখন কোন তারিখে কোন মাসের বেতন পাবেন তারও কোন নিশ্চয়তা থাকে না। তবুও সাংবাদিকদের কলম চলে, ক্যামেরা কথা বলে। সমাজের নানা অনিয়ম-অনাচারের চিত্র তুলে ধরার কারণে অনেকের অকালে জীবনও যায়। তারপরও সাংবাদিকরা কাজ করেন, করে যাচ্ছেন নানা সংকটের মধ্যে দিয়ে। যুদ্ধ বিগ্রহ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়েও সাংবাদিকরা ঘরে বসে থাকেন না। প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সঠিক তথ্যের সন্ধানে বেড়িয়ে যান। খবর সংগ্রহ করে দেশ ও জাতিকে জানান। তাই সাংবাদিকরা ব্যক্তি মালিকাধীন প্রতিষ্ঠানে চাকরি করলেও তাদের কাজ মূলত রাষ্ট্রের জন্য। সেজন্যই সাংবাদিকতাকে রাষ্ট্রের ‘চতুর্থ স্তম্ভ’ বলা হয়ে থাকে। 
এখানেও প্রশ্ন থাকে, সাংবাদিকরা যদি রাষ্ট্রের জন্যই কাজ করে তবে রাষ্ট্র কেন তাদের জীবন-জীবিকার নিশ্চয়তা দেয় না। দেয় না এ কারণে, রাষ্ট্রের বেতনভুক্ত লোকজন রাষ্ট্রের কর্মচারী। রাষ্ট্র পরিচালনাকারী সরকারের ইচ্ছানুযায়ী তাদের কাজ করতে হয়। সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে কখনো কখনো স্বৈরাচারী, স্বেচ্ছাচারী হয়ে যেতে পারে। বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে মৌলিক মানবাধিকার থেকেও বঞ্চিত করতে পারে। রাষ্ট্রের কর্মচারীরা তা দেখলেও সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কথা বলতে পারেন না। এক্ষেত্রে একমাত্র বিকল্প হচ্ছে গণমাধ্যম। গণমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিকরা সাহসিকতার সাথে সকল অনিয়ম, অনাচার আর অবিচারের কথা জাতির সামনে তুলে ধরতে পারেন। সাংবাদিকরা যদি সরকারের বেতনভুক্ত কর্মচারী হন তবে এ কাজটি তারা করতে পারবেন না। এ কারণেই রাষ্ট্র সাংবাদিকদের বিবেকের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে।
করোনাকালে বেশিরভাগ গণমাধ্যমের মালিক পক্ষ তার প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সাংবাদিক-শ্রমিক-কর্মচারীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার ব্যবস্থা করেনি। দেয়নি জীবিকার নিশ্চয়তা; বরং বাস্তবে হয়েছে উল্টো। সবাই জানে করোনাকালে বিপুল সংখ্যক সংবাদকর্মী চাকরিচ্যুত হয়েছেন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করেও অনেক সংবাদকর্মী বেতন-ভাতা পাননি। লকডাউনের সময়ও অনেককে নিজ ব্যবস্থাপনায় অফিস আসতে-যেতে হয়েছে। পাশাপাশি আর্থিক সংকটের অজুহাতে বেশকিছু সংবাদপত্র প্রকাশনা বন্ধ করে দেয়ায় প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা পথে বসতে বাধ্য হয়েছেন।
ফলে করোনা মহামারির সময়ে সংবাদকর্মীদের জীবিকা নির্বাহ করার ক্ষেত্রে নতুন অভিজ্ঞতা হয়েছে। কমবেশি সকল পর্যায়ের সংবাদকর্মীরা উপলব্ধি করেছেন, এ পেশার মানুষ কতটা অসহায়, নিরাপত্তাহীন। 
বিশ্বের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থায় সাংবাদিকদের কর্মের স্বাধীনতাসহ জীবন-জীবিকার বিষয়কে গুরুত্ব দেয়া হয়। আবার এর উল্টোটাও আছে। বাংলাদেশ রাষ্ট্রেও সংবাদপত্রের তথা সাংবাদিকদের স্বাধীনতা ও জীবন-জীবিকার সুরক্ষায় কতগুলো আইন ও বিধি-বিধান রয়েছে। তথ্য মন্ত্রণালয়ের কাজই হচ্ছে এগুলো দেখভাল করা। সরকারের যেমন সবকিছু দেখভাল করার দায়িত্ব তেমনি সাংবাদিক ইউনিয়নের কাজ কর্মরত প্রতিষ্ঠানের মালিকপক্ষের কাছ থেকে ন্যায্য পাওনা আদায়ে সোচ্চার থাকা। মালিকপক্ষ ইউনিয়নের দাবি না মানতে চাইলে প্রয়োজনে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা, যাতে সরকার বাধ্য হয় রাষ্ট্রের প্রচলিত আইন অনুযায়ী সংবাদকর্মীদের ন্যায্য পাওনা পরিশোধে মালিকদের বাধ্য করে। 
সংবাদকর্মীদের রুটি-রুজির নিশ্চয়তা প্রদান ও মর্যাদা রক্ষার ক্ষেত্রে আইনি প্রতিনিধি হচ্ছে সাংবাদিক ইউনিয়ন। সাংবাদিক ইউনিয়নের কাজ কর্মরত প্রতিষ্ঠানের মালিক ও সরকারের কাছ থেকে সাংবাদিকদের ন্যায্য অধিকার আদায় করে নেয়া। ক্লাবে মানুষ যায় টাকা খরচ করে আনন্দ বিনোদন করতে। তবে ইউনিয়ন ক্লাব নয়, অধিকার বঞ্চিত সাংবাদিকদের ন্যায্যতা আদায় করার মাধ্যম। সদস্যদের অধিকার সংরক্ষণে ইউনিয়ন সর্বদা দায়বদ্ধ। 
সাংবাদিক ইউনিয়ন এই আইনি অধিকার পেয়েছিল ১৯৭৪ সালে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সাংবাদিকদের জীবন-জীবিকার খবরা-খবর রাখতেন। তিনি জানতেন সাংবাদিকতা পেশার ঝুঁকির বিষয়গুলো। তাই তিনি ১৯৭৪ সালে `The Newspaper Employees (Serviccs & Condition) Act 74' প্রণয়ন করে সাংবাদিকদের অধিকার ও মর্যাদাকে রাষ্ট্রীয় আইনের মাধ্যমে সুরক্ষিত করেন। ওই আইনের আলোকেই গঠন করা হয় ওয়েজবোর্ড। ঘোষণা করা হয় রোয়েদাদ। প্রচলিত আইন ও বিধি-বিধানসহ সাংবাদিকতার নীতিমালার আওতায় দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয় ‘বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল’। 
সাংবাদিক ইউনিয়নের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার প্রতি পাঁচ বছর পরপর সংবাদপত্র শিল্পের সাংবাদিক-শ্রমিক-কর্মচারীদের জন্য ওয়েজবোর্ড গঠন করে। ওয়েজবোর্ড শুধুমাত্র একটি বেতন কাঠামো নয়, রাষ্ট্রের আইন। এই আইনে সংবাদকর্মীদের বেতন-ভাতার অধিকারসহ মর্যাদা নিশ্চিত করা হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠানগুলো বর্তমানে এই ওয়েজবোর্ড মানছে না। তারা অন্যান্য শিল্প ও ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের মতো মর্জি মাফিক গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান চালাতে আগ্রহী। ফলে সাংবাদিকতা পেশায় ক্রমান্বয়ে নানা রকমের অনাচার, অবিচার ও দুর্বৃত্তায়ন সৃষ্টি হচ্ছে। পাশাপাশি পাল্লা দিয়ে সংবাদপত্র শিল্পে শুরু হয় বেসুমার লুটপাট। শত ফুল ফুটতে দেয়ায় যুক্তিতে দুর্নীতিবাজ, লুটেরাদের হাতে তুলে দেয়া হয় সংবাদপত্রের মালিকানা। পড়ালেখা নেই, নেই ভাষা জ্ঞান; নিজের নাম লিখতে অক্ষম, ভালো করে কথা পর্যন্ত বলতে পারে না- এমন সব লোক রাতারাতি হয়ে যায় গণমাধ্যমের মালিক, সম্পাদক, প্রকাশক। এতে অশিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত অযোগ্য শ্রেণীর লোক সাংবাদিক পরিচয়ে সমাজে বিচরণের সুযোগ লাভ করে। অপরদিকে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সাংবাদিকতা বিষয়ে অনার্সসহ উচ্চতর শিক্ষার ব্যবস্থা থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাংবাদিকতার উচ্চতর ডিগ্রি নিয়েও অনেকে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে চাকরি পান না। ফলে পেশা হিসেবে সাংবাদিকতা এখনো পূর্ণাঙ্গ হতে পারেনি। 
বর্তমানে বাংলাদেশে সাংবাদিকতার ‘সংজ্ঞা’ নির্ধারণ করা রীতিমতো গবেষণার বিষয়। অপরদিকে সংবাদপত্রকে বানানো হয়েছে, গণমাধ্যম শিল্প। আমার বিবেচনায় শব্দগত দিক থেকে সংবাদপত্র, সাংবাদিকতা আর গণমাধ্যম বা গণমাধ্যম কর্মীর মধ্যে পার্থক্য আছে। ‘সাংবাদিককতা’ শব্দে পেশাগত মর্যাদার একটা বিষয় আছে। কিন্তু ‘গণমাধ্যম কর্মী’ শব্দে তা নেই। এতে কেমন যেন কর্মচারী কর্মচারী ভাব রয়েছে। বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ সাংবাদিকদের ‘সাংবাদিক’ হিসেবেই জানেন এবং সম্মান দেন। তা সত্ত্বেও নানা অজুহাত ও যুক্তি দেখিয়ে খুব ঠাণ্ডা মাথায় সাংবাদিকদের মান-মর্যাদা ধূলোয় মিশিয়ে দেয়ার জন্য সুপরিকল্পিতভাবে এ কাজগুলো করা হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে।
বর্তমানে সংবাদপত্র বা গণমাধ্যম শিল্পে বহু পক্ষের আবির্ভাব ঘটেছে। মালিক, সম্পাদক, প্রকাশকদের অনেক দল, অনেক গ্রুপ। এসব দল আর গ্রুপের সৃষ্টি হয়েছে স্বার্থের জন্য। কারণ সংবাদপত্র শিল্প বর্তমানে একটি লাভজনক ব্যবসায়ী খাত। তাই সারাদেশে হাজার হাজার পত্রিকা, রেডিও, টেলিভিশন। তার সাথে এখন যোগ হচ্ছে, অনলাইন নিউজ পোর্টাল আর আইপি টিভি। কিন্তু কেউই সাংবাদিক-শ্রমিক-কর্মচারীদের ঠিকমতো বেতন দেয় না, ওয়েজবোর্ড মানে না। ক্ষেত্র বিশেষে সাংবাদিকদের কাছ থেকে নানা রকমের সুবিধা আদায় করে নেয়। সাংবাদিকদের পরিচয়পত্র এখন নগদ টাকায় বেচা-কেনা হয়। 

২০০৬ সালে বিএনপি-জামাত জোট সরকার সাংবাদিকদের অধিকার ও মর্যাদার রক্ষাকবচ  `The Newspaper Employees ( Serviccs & Condition) Act 74' আইনটি বাতিল করে শ্রম আইনের আওতায় ফেলে সাংবাদিকদের কল-কারখানার শ্রমিকদের কাতারে নামিয়ে দেয়া হয়। এতে সাংবাদিকদের মেধাভিত্তিক শ্রমের মর্যাদা ও মূল্য বিনষ্ট হয়ে যায়। এর বিরুদ্ধে সাংবাদিক ইউনিয়নের লাগাতার আন্দোলনের প্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা সাংবাদিকদের মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তাদের জীবিকার নিশ্চয়তার জন্য ৭৪ সালের আইনটিকে সময়োপযোগী করে নতুন একটি আইন প্রণয়ন করার নির্দেশ প্রদান করেন। 
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সাংবাদিকদের সবকিছুকে একত্রিত করে ‘ওর স্যালাইনের মতো’ এক চিমটি নূন, এক মুঠো গুড়, আধা লিটার পানি মিশিয়ে ‘দে ঘুটা’ পদ্ধতিতে সাংবাদিকদের ‘কর্মী’ হিসেবে রূপান্তরিত করে নতুন আইন করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়; যার নাম ‘গণমাধ্যমকর্মী আইন’। এর পেছনে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর করপোরেট পুঁজির ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু তারা নিজেরা এসব করেনি। করিয়েছে সরকারে আমলা এবং ‘বিশেষভাবে খ্যাতিমান’ সাংবাদিক ও ব্যক্তিদের মাধ্যমে। প্রধানমন্ত্রীর যত সদিচ্ছাই থাকুক না কেন ‘লাইন টু লাইন’ পাঠ করে, দেখে শুনে কোনো আইন প্রণয়ন করা সম্ভব নয়। ফলে তিনি যা করতে বলেছিলেন, তার বদলে হতে যাচ্ছে ভিন্ন মাত্রায় অন্যকিছু। এসব বিষয়ে ইউনিয়নের পক্ষ থেকে তথ্য মন্ত্রণালয়ে বৈঠকের পর বৈঠক করে প্রস্তাবিত ‘গণমাধ্যকর্মী আইন’কে সাংবাদিক-শ্রমিক-কর্মচারীদের স্বার্থের অনকূলে রাখার জন্য সব রকমের পদক্ষেপ নেয়া হলেও সত্যিকার অর্থে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। এ বিষয়ে নিশ্চিত করে বলা যায়, সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলে সদিচ্ছার ঘাটতি রয়েছে। 
এদিকে নোয়াবের বিরোধিতা সত্ত্বেও ইউনিয়নের যৌক্তিক দাবির কথা বিবেচনায় নিয়ে প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা সাংবাদিক-শ্রমিক-কর্মচারীদের জন্য নবম ওয়েজবোর্ডের গেজেট প্রকাশের নির্দেশ দিলে নোয়াব ওই গেজেট প্রকাশের বৈধতা নিয়েও হাইকোর্টে রিট করে। তথ্য মন্ত্রণালয় ওই রিটের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই শুরু করলে চূড়ান্ত পর্যায়ে শুনানিতে সুপ্রিমকোর্ট বলেছে, ‘সাংবাদিক ছাড়া সংবাদপত্রের মালিকরা অস্তিত্বহীন’। তার মানে হচ্ছে, রাষ্ট্রের আইন মনে করে, সংবাদপত্রের অন্ত:প্রাণ হচ্ছেন সাংবাদিক। আর এজন্যই রাষ্ট্র ওয়েজবোর্ড আইন দ্বারা সংবাদকর্মীদের অধিকার ও মর্যাদা সুনিশ্চিত করেছে। দীর্ঘদিনের সেই অধিকার ও মর্যাদা চিরতরে বিনষ্ট করে সংবাদকর্মীদের আবারো দিনমজুর বানানোর চক্রান্ত শুরু হয়েছে। নোয়াবের ওই মামলা এখনো বিচারাধীন। যার ফলে দেশের কোথাও কোন সংবাদপত্রে যথাযথভাবে ওয়েজবোর্ড বস্তবায়ন হয়নি।
করোনা মহামারির সময়ে দেশে ডাক্তার নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও সেনা সদস্যদের পাশাপশি সাংবাদিকরা সম্মুখযোদ্ধা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং এখনো করে যাচ্ছেন। এ কাজে সম্পৃক্ত সকলের জীবন-জীবিকার সুরক্ষা নিশ্চয়তা থাকলেও সাংবাদিকদের নেই। করোনা মহামারির এই দুঃসময়ের মধ্যেও ছাঁটাই, বেতন না দেয়া, কমিয়ে দেয়া ইত্যাদি নানা ধরনের নিপীড়নের মধ্যেও সাংবাদিকরা দায়িত্ব পালন করেছেন।
অথচ বাস্তবতা হচ্ছে, বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস শনাক্ত হওয়ার সাথে সাথেই (দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া) মালিকপক্ষ শুরু করেন ঢালাওভাবে ছাঁটাই। একের পর এক প্রত্রিকার প্রকাশনা বন্ধ করে দেয়া হয়। এ সময় ইউনিয়নের পক্ষ থেকে মালিকদের বার বার অনুরোধ করা হয় তারা যেন ঢালাওভাবে ছাঁটাই বন্ধ করেন। এ দাবিতে ইউনিয়ন নিয়মিত মিটিং, মানববন্ধন করতে শুরু করে। ততদিনে শত শত সাংবাদিক-শ্রমিক-কর্মচারীকে চাকরিচ্যূত করে পথে বসতে বাধ্য করা হয়। এই ছাঁটাই প্রক্রিয়া এখনো চলছে। 
বাংলাদেশে বর্তমানে কতিপয় গণমাধ্যম মালিক, সম্পাদক, প্রকাশকসহ একশ্রেণীর সাংবাদিকরা রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ ‘গণমাধ্যমকে’ কেবল নিজেদের বাণিজ্যিক স্বার্থ সিদ্ধির জন্য ব্যবহার করছেন। ফলে রাষ্ট্রের ‘চতুর্থ স্তম্ভ’ হিসেবে সাংবাদিকতা উজ্জ্বলতর ভাবমূর্তি নিয়ে দাঁড়ানোর চেয়ে ক্রমেই কালিমা লিপ্ত হয়ে অতীত ঐতিহ্য হারাতে বসেছে। 
এ অবস্থা চলতে থাকলে বর্তমান সময়ের মেধাবী কোনো ছেলে-মেয়ে সাংবাদিকতা পেশায় আসবে না। কারণ, তারা দেখছে এ পেশায় জীবন ও জীবিকার কোনো নিশ্চয়তা নেই। বিষয়টি গভীরভাবে ভাবার সময় এসেছে। এমতাবস্থায় পেশার মর্যাদা রক্ষার স্বার্থে সাংবাদিক, সম্পাদক, প্রকাশকসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে ব্যক্তিগত স্বার্থ চিন্তার উর্ধ্বে পেশাগত সুরক্ষা ও মর্যাদাকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। তাতে একদিকে যেমন পেশাদারিত্ব বাড়বে তেমনি সমাজ-রাষ্ট্রে সাংবাদিকতার মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে। তা না হলে সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। ওয়েজ বোর্ড না থাকলে গণমাধ্যমের সম্পাদক থেকে শুরু করে সাধারণ কর্মচারি সকলেই ‘মজুরে’ পরিণত হবেন। দিনমজুর দিনভর কাজ করেন কাস্তে, কোদাল, হাতুরি, শাবল দিয়ে। গণমাধ্যম কর্মীরা কাজ করবেন কলম আর ক্যামেরা দিয়ে। দিনমজুরের যেমন মজুরি থাকলেও সেই অর্থে মর্যাদা নেই। তেমনি ওয়েজবোর্ড না থাকলে সাংবাদিকরা মজুরি পেলেও মর্যাদা হারাবেন। সাংবাদিকের মর্যাদা না থাকলে এ পেশার অস্তিত্বই থাকে না। শুধু সাংবাদিক ও সম্পাদক নয়, প্রকাশকরাও গুরুত্বহীন হবেন।
বর্তমানে গণমাধ্যম শিল্পে মোটা অংকের করপোরেট পুঁজির বিনিয়োগ হচ্ছে। বিনিয়োগকারীরা ব্যবসায়ী। তাদের অনেক ব্যবসা আছে। তারা ব্যবসায়ী হিসেবেই সমাজ-রাষ্ট্রে পরিচিত। ব্যবসার মূল লক্ষ্য মুনাফা। কোন কোন ব্যবসা সেবাধর্মী হলেও মুনাফার কারণে সেবার বিষয়টি গুরুত্ব পায় না। এক্ষেত্রে গণমাধ্যম ব্যতিক্রম। এখানে ব্যবসা থাকলেও সেবার বিষয়টি সর্বক্ষেত্রে প্রাধান্য পায়। ফলে সমাজ-রাষ্ট্রসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ একজন প্রকাশককেও সাংবাদিকের মর্যাদার চোখে দেখে। অন্য শিল্পে বিনিয়োগে তিনি বেশি মুনাফা পেলেও গণমাধ্যম শিল্পে বিনিয়োগে তার মর্যাদা বাড়ে। সুতরাং গণমাধ্যমকে মুনাফার হাতিয়ার কিংবা ঢাল হিসেবে না দেখে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করলে সব পক্ষই লাভবান হবেন। এখানে লোকসান দিয়ে গণমাধ্যম চালানোর প্রশ্ন অবান্তর। কারণ, ‘রাষ্ট্র’ গণমাধ্যম শিল্পে বহুমাত্রিক সহায়তা প্রদান করে। বর্তমান প্রযুক্তির যুগে গণমাধ্যমে যত রকমের পরির্বত ও সংযোজন আসছে তার সব কিছুতেই ‘রাষ্ট্র’ সহায়তার হাত বাড়াচ্ছে। কোন কোন ক্ষেত্রে চাহিদার তুলনায় হয়তো সহায়তা কম। কিন্তু সহায়তা আছে। সময়ে সময়ে তা বৃদ্ধি পায়। 
বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সৃষ্টি পর  থেকে গণমাধ্যম শিল্পে রাষ্ট্রের সহায়তা কমে যাওয়ার কোন নজির নেই। কিন্তু গণমাধ্যম কর্মী হিসেবে সাংবাদিক নির্যাতন-নিপীড়নের গল্প দিন দিন বেড়েই চলছে। নবম ওয়েজ বোর্ডের বিরুদ্ধে নোয়াবের মামলার প্রেক্ষিতে সুর্প্রীম কোর্টের ঐতিহাসিক রায় খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। ওই রায়ে বলেছেন, ‘সাংবাদিক ছাড়া সংবাদপত্র মালিকরা অস্তিত্বহীন’। তাই সুপ্রিম কোর্টের রায়ের অন্তর্নিহিত নির্দেশনা ঊর্ধ্বে রেখে সম্পাদক, প্রকাশক, সাংবাদিকসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে পেশার সুরক্ষা ও মর্যাদা সমুন্নত রাখতে সবার সচেষ্ট হওয়া জরুরি।
এখানে কেউ কাউকে ঠকিয়ে বেশিদিন টিকতে পারবে না। এতে পক্ষগুলো পরস্পরের মুখোমুখি হয়ে যে সংগ্রাম, সংঘাত ও সংঘর্ষ করবে তাতে ‘রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভের’ মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত হবে। সাংবাদিকরা সমাজ-রাষ্ট্রে ক্রমাগত প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে একসময় অস্তিত্বহীন হয়ে যাবে; যার আলামত দৃশ্যমান। তাই রাজনৈতিক মতাদর্শগত মতপার্থক্য থাকলেও এই মুহূর্তে প্রয়োজন- মালিকপক্ষের উদ্দেশ্যমূলক খাতির-যত্নের লোভ-লালসা পরিহার করে সকল ধরনের গণমাধ্যমে সাংবাদিক-শ্রমিক-কর্মচারিদের পেশাগত ঐক্য এবং ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন। এর কোন বিকল্প নেই।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক, সভাপতি, বিএফইউজে .

এনএনবি নিউজ/ ডিকে






আরও খবর


সর্বশেষ সংবাদ
কুমিল্লা হবে ‘মেঘনা’, ফরিদপুর ‘পদ্মা’ বিভাগ : প্রধানমন্ত্রী
পাপুয়া নিউগিনিকে হারিয়ে বিশ্বকাপের মূল পর্বে টাইগাররা
মানুষের পাশে অতন্দ্র প্রহরীর মতো রয়েছে সরকার ​: তথ্যমন্ত্রী
একটি শক্তিশালী বিরোধী দল সরকারও চায় : কাদের
শাহরুখ খানের মুম্বাইয়ের বাড়িতে তল্লাশি চালিয়েছে গোয়েন্দারা
কুমিল্লার কাজটি সে তো প্ল্যান মাফিক করেছে : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
পূর্বাচলে প্রদর্শনী কেন্দ্রের উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
তাইওয়ানে আবাসিক ভবনে আগুন, নিহত ৪৬
বাংলাদেশ একটি অসাম্প্রদায়িক চেতনার দেশ : প্রধানমন্ত্রী
অবশেষে বলিউডে বাঁধন!
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ২২ জেলায় বিজিবি মোতায়েন
কান্দাহারে শিয়া মসজিদে হামলার ঘটনায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৪৭
২৭ দিন চিকিৎসা শেষে বাসায় ফিরেছেন কাদের সিদ্দিকী
দেশকে বিক্রি করে তো ক্ষমতায় আসব না : প্রধানমন্ত্রী
সম্পাদক : মোল্লা জালাল | নির্বাহী সম্পাদক: দুলাল খান
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ৪২/১-ক সেগুনবাগিচা, ঢাকা-১০০০, বাংলাদেশ।  ফোন +৮৮ ০১৮১৯ ২৯৪৩২৩
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত এনএনবি.কম.বিডি
ই মেইল: [email protected], [email protected]